বন্ধ হচ্ছে টু-জি নেটওয়ার্ক, বাটন ফোন কি অচল হবে?
বিটিআরসির প্রস্তাবিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, টু-জি প্রযুক্তি বন্ধের কার্যক্রম কয়েকটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে—
- ডিসেম্বর ২০২৬: নতুন কোনো টু-জি হ্যান্ডসেট মডেলের অনুমোদন দেওয়া হবে না।
- ৩১ মার্চ ২০২৭: দেশে টু-জি মোবাইল ফোন উৎপাদন বন্ধ করা হবে।
- ৩০ জুন ২০২৭: বাজারে টু-জি ফিচার ফোন বিক্রি নিষিদ্ধ করা হবে।
- ডিসেম্বর ২০২৯: গ্রাহক পর্যায়ে সম্পূর্ণভাবে টু-জি নেটওয়ার্ক সেবা বন্ধ করা হবে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৬ কোটি ১৩ লাখ গ্রাহক টু-জি ফোন ব্যবহার করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এসব ব্যবহারকারীর বড় একটি অংশের ফোনে ফোর-জি বা ভোল্টি (VoLTE) প্রযুক্তি সমর্থন করে না। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে গেলে এসব ফোনে প্রচলিত মোবাইল ভয়েস কল সুবিধা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে সব বাটন ফোন ব্যবহারকারীকে নতুন করে স্মার্টফোন কিনতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। যেসব বাটন ফোনে ফোর-জি সংযোগ ও ভোল্টি প্রযুক্তি রয়েছে, সেগুলো টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধের পরও সচল থাকার কথা। অপারেটরদের মতে, ভবিষ্যতে ফোর-জি ও ফাইভ-জি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ভয়েস কল পরিচালনার পাশাপাশি ইন্টারনেটভিত্তিক ওটিটি (OTT) কলিং সেবার ব্যবহারও বাড়বে।
তবে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের পাশাপাশি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে সাধারণ গ্রাহকদের আর্থিক সক্ষমতা ও অভ্যাস। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, নিম্নআয়ের পরিবার এবং প্রযুক্তিতে কম অভ্যস্ত গ্রাহকদের কাছে বাটন ফোন এখনো যোগাযোগের অন্যতম সহজ মাধ্যম। টাচস্ক্রিন স্মার্টফোনের পরিবর্তে পরিচিত বাটন ফোন ব্যবহারেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তাঁদের অনেকে।
বর্তমান বাজারে সাধারণ টু-জি বাটন ফোন পাওয়া যায় প্রায় ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকায়। বিপরীতে একটি সাধারণ ফোর-জি স্মার্টফোনের দাম শুরু হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার টাকা থেকে। ফলে নতুন প্রযুক্তিতে যেতে হলে নিম্নআয়ের গ্রাহকদের জন্য বাড়তি অর্থ ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইওএবি) সভাপতি জাকারিয়া শহীদ মনে করেন, একবারে টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করা হলে অবৈধ হ্যান্ডসেটের বাজার বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, গ্রাহকদের সহজে ফোর-জি প্রযুক্তিতে নিয়ে আসতে কিস্তিতে হ্যান্ডসেট কেনার সুযোগ এবং সাশ্রয়ী ডেটা ও ভয়েস বান্ডেল প্যাক চালু করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকার ৪ থেকে ৫ হাজার টাকার মধ্যে সাশ্রয়ী স্মার্টফোন বাজারে আনার উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে নতুন প্রযুক্তিতে রূপান্তরের আর্থিক চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, টেলিযোগাযোগ অপারেটররা টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের মতো অপারেটরদের মতে, পুরোনো প্রযুক্তির নেটওয়ার্ক বন্ধ হলে ব্যবহৃত স্পেকট্রাম বা তরঙ্গ আরও দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগানো যাবে। পাশাপাশি নেটওয়ার্ক পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় কমবে।
অপারেটরদের প্রত্যাশা, অব্যবহৃত বা পুনর্বিন্যাসযোগ্য তরঙ্গ আধুনিক নেটওয়ার্কে কাজে লাগানো হলে ফোর-জি ও ফাইভ-জি সেবার মান উন্নত করা সম্ভব হবে। এতে গ্রাহকরা আরও উন্নত ইন্টারনেট সংযোগ ও ডিজিটাল সেবার সুবিধা পাবেন।
সব মিলিয়ে টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধের পরিকল্পনা দেশের টেলিযোগাযোগ খাতকে আধুনিক প্রযুক্তির দিকে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এ পরিবর্তনের সুফল যেন শুধু শহর বা উচ্চআয়ের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করাও জরুরি। বিশেষ করে স্বল্পমূল্যের ফোর-জি বাটন ফোনের সহজলভ্যতা, সাশ্রয়ী ভয়েস প্যাকেজ এবং গ্রামীণ পর্যায়ে নেটওয়ার্ক সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে বিপুলসংখ্যক সাধারণ গ্রাহক নতুন প্রযুক্তিতে যুক্ত হতে সমস্যায় পড়তে পারেন।




মন্তব্যসমূহ (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!